
নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর ও খতিয়ানের ফটোকপি সংগ্রহে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ; তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি স্থানীয়দের
মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি:
ভোলার মনপুরা উপজেলার সাকুচিয়া ও হাজিরহাট ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভূমি কর্মকর্তা রুবেলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে একই উপজেলায় দুটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং জমির খতিয়ানের ফটোকপি সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির নামজারি করতে গিয়ে আবেদনকারীদের কাছ থেকে ৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি ও প্রকৃত খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করছেন। এতে ভূমিসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো জমির নির্ধারিত খাজনা ১৫০ টাকা হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ পরে অনলাইন স্লিপে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা উল্লেখ থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাই সরকারি রসিদ এবং অনলাইন রেকর্ড যাচাই করে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, জমির খতিয়ানের ফটোকপি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ-সংক্রান্ত সেবা পেতে সরকারি নিয়ম ও অনুমোদিত ফি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো, একই জমির একাধিক মালিকের কাছ থেকে আলাদাভাবে খাজনা আদায়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো জমির মালিক চার ভাই হলে তাঁদের একজন খাজনা দিতে গেলে পুরো জমির খাজনা পরিশোধের কথা বলা হয়। জমি বিক্রি বা নামজারির প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাধ্য হয়ে পুরো জমির খাজনা পরিশোধ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে একই জমির অন্য মালিক ছয় মাস পর ভূমি অফিসে গেলে তাঁর কাছ থেকেও আবার খাজনা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মনপুরার সাধারণ মানুষ নানা সরকারি সেবা পেতে এমনিতেই ভোগান্তির শিকার হন। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ অনেক সময় সরকারি ফি, ভূমিসেবার নিয়ম কিংবা অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পান না। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে তার প্রতিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাঁদের দাবি, ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি, সেবার মূল্যতালিকা প্রকাশ এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিদর্শন হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগের বিষয়ে কী ধরনের তদন্ত হয়েছে এবং হয়ে থাকলে তার ফলাফল কী? তবে জেলা প্রশাসকের পরিদর্শন, তদন্তের অগ্রগতি কিংবা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য ও নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কমল নামের এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই স্থানে কর্মরত থাকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিযোগকারীরা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত, দুই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আর্থিক নথি নিরীক্ষা, নামজারির আবেদন ও ফি যাচাই, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ এবং অনলাইন রেকর্ড মিলিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে ভূমি কর্মকর্তা রুবেল, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এ ঘটনার নেপথ্যে আরও কী তথ্য রয়েছে, অভিযোগগুলোর পক্ষে কী ধরনের নথি ও প্রমাণ সামনে আসছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে—তা নিয়ে বিস্তারিত আসছে পরবর্তী পর্বে।
Leave a Reply